তৃণমূলে চিকিৎসা সেবার ভরসা উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারগণ

ডেস্ক রিপোর্ট :: দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে যখন এমবিবিএস (MBBS) চিকিৎসক সংকট, যখন তারা গ্রামবিমুখ তখন এক প্রকার নিরবে আপন মনে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে যাচ্ছেন চার বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি ডি.এম.এফ (DMF) ডিপ্লোমাধারী ডিপ্লোমা চিকিৎসক- উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা। তৃণমূলে চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসা হিসেবে জনসাধারণের আস্থাভাজন হয়েছেন উপ- সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারগণ।

তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলা সদর হাসপাতাল পর্যন্ত এই সকল ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসকগণ জরুরী চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে সাধারণ প্রায় সকল রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন।

উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ‘SACMO-এসএসিএমও’ পরিচয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, তারা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত বিভিন্ন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল তথা ম্যাটস্ থেকে ৪ (চার) বছর মেয়াদি মেডিকেল ডিপ্লোমা কোর্স শেষে বাংলাদেশ রাস্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ থেকে “ডিএমএফ” ডিপ্লোমা অর্জন করেন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএম এন্ড ডিসি) থেকে ডিপ্লোমা চিকিৎসক পেশাদার হিসেবে রেজিস্ট্রেশন সনদ লাভ করেন।

পরবর্তিতে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধিনে প্রতিটি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে একটি, ( একটি স্বাস্থ্য বিভাগের একটি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ টি করে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের পদ রয়েছে।

নিয়োগ প্রাপ্ত এসকল উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারগণ ২৪ ঘন্টা গ্রামের ক্লিনিকগুলো থেকে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর জরুরী স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য সেবা, প্রসূতি সেবা নিশ্চিত করেন।

কোন কোন উপজেলা এবং জেলায় গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক সংকট থাকায় এসকল উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা জরুরী বিভাগ সহ আউটডোর, ইনডোরে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েসনের মহাসচিব ডাঃ সিরাজুল ইসলাম বাচ্চুর বলেন, ‘দেশে এমবিবিএস চিকিৎসক সংকট এবং তৃণমূলে তাদের না যাওয়ার পরও আমাদের সহকর্মীরা দিনের পর দিন সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে চলছেন। অথচ আমাদের কোন পদোন্নতি নেই। চাকুরী ক্ষেত্রে নানা বৈষম্যের স্বীকার অামরা। আমাদের সমান যোগ্যতা সম্পন্ন অন্যান্য ডিপ্লোমাধারীদের সরকার ১০ গ্রেডে উন্নতি করলেও অজানা কারণে আমাদের বেতন গ্রেড এখনো ১০ম গ্রেডে উন্নতি করা হয় নাই।
বিগত সরকারের আমলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনাব মোহম্মদ নাসিম ৩ মাসের মধ্যে অামাদের বেতন গ্রেড ১০ম গ্রেডে উন্নতি করার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। অজানা শক্তির কারণে আমাদের ১০ম গ্রেডের ফাইল বারবার ফেরত আসছে। চাকুরীক্ষেত্রে পদোন্নতি না থাকার কারণে অামাদের সহকর্মীরা দিন দিন হতাশায় ভুগছেন। দীর্ঘ বছর চাকুরী করার পর একটা জনপ্রশাসন পদক ছাড়া এই জাতির ভাগ্যে অন্য কোন পদোন্নতি, বেতন স্কেল পরিবর্তন ঘটেনি। নেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ। অথচ সমমান অনেক ডিপ্লোমাঃ যেমন নার্স, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, ডিপ্লোমা কৃষিদের অনেক আগেই ১০ম গ্রেডে উন্নতি করা হয়েছে। রয়েছে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সহ নানা স্তরে পদোন্নতির সুযোগ। এই সকল বিষয় নিয়ে ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশনের নেতারা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিভিন্ন সময় যোগাযোগ করলেও কোন সুরাহা আজ পর্যন্ত মেলেনি। আন্দোলন করেও বারবার ব্যর্থ হয়েছি আমরা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মহাপরিচালক, বিএমএ এর নেতারা বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতির আজো বাস্তবায়ন হয়নি। এই বিষয়ে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
বর্তমানে দেশে ম্যাটসের সংখ্য প্রায় ২১৮ এর মত। পূর্বে শুধুমাত্র সরকারী ম্যাটস্ থাকেলও অধিক জনবল তৈরির জন্য ২০০৯ সালে বেসরকারী ম্যাটেসের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল এসোসিয়েশনের শিক্ষা ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ডাঃ মিঠুন সরকার বলেন, ‘দেশে এখন সরকারী ৯টি এবং বেসরকারী ২০৯ টির মতো ম্যাটস্ রয়েছে। প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ৩০,০০০(ত্রিশ-হাজার) ছাত্রছাত্রী পাশ করে বের হয়। কিন্তু ম্যাটস্ থেকে পাশ করার পর বিএম&ডিসি কাউন্সিল স্বীকৃত উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকায় এসকল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা নেয়ার কোন সুযোগ পাচ্ছেনা। এছাড়াও চাকুরীর সুযোগ ও সরকারি নিয়োগ না হওয়ায় দেশে প্রায় ১ এক লক্ষ বেকার ডিপ্লোমা চিকিৎসক মানবেতর দিন যাপন করছে।
তিনি আরো বলেন বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্রেনচাইল্ড; ওয়ার্ড ভিত্তিক “কমিউনিটি ক্লিনিক।” দেশে প্রায় ১৩৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে যদি ম্যাটস্ থেকে পাশ করা ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে এক দিকে যেমন ডিপ্লোমাধারীদের বেকারত্ব কমবে তেমনি এইসব ক্লিনিকে আসা জনগোষ্ঠিরও সঠিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে।’

একটা অভিযোগ সাংবাদিকরা বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করছে যে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার গুলোতে ডাক্তার থাকছেন না। কিন্তু কোনো রোগী চিকিৎসা ছাড়া ফেরত গেছেন এরকম অভিযোগ আমরা পাইনি। তাহলে কারা দিচ্ছেন চিকিৎসা সেবা ? চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এই সকল উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারগণ। যারা অজানা কারণে বরাবরই পর্দার আড়ালেই রয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধবিদ্ধস্থ গ্রাম বাংলার জনগণের দোড়গোড়ায় দ্রুত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই মধ্যম মানের চিকিৎসক তৈরি করার উদ্যোগ নেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এই মধ্যমমানের চিকিৎসকগণের বিষয়ে নানা পরিকল্পনা থাকলেও বঙ্গবন্ধুর প্রয়ানের পর কোন এক অজানা কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে উচ্চশিক্ষা সহ নানাবিধ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই মধ্যম মানের চিকিৎসকগণ।

গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকগণ যখন সাব সেন্টার/ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে অবস্থান করছেন না তখন দিনের পর দিন আরাম আয়েশ ভুলে জনগণের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে যাচ্ছেন এই ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণ। কিন্তু, অজানা শক্তির কারণে বরাবরই তারা রয়ে যাচ্ছেন পর্দার আড়ালে।

নেই তাদের উচ্চশিক্ষা। নেই প্রমোশন। নেই স্বীকৃতি। এক চেয়ারেই জীবন চলে যাচ্ছে এই সকল চিকিৎসকগণের। ফলে হতাশাগ্রস্ত হচ্ছেন এসকল চিকিৎসকগণ। এসকল সুযোগ যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে জনগণ আরো উন্নত চিকিৎসা সেবা পেতো।

দেশে যখন গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক সংকট এবং গ্রামে যেতে অনাগ্রহী তখন তৃণমূলের ভরসা এই সকল ডিপ্লোমাধারী চিকিৎসকরা। দিনরাত সার্বক্ষণিক জনগণের পাশে থেকে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করে যাচ্ছেন। অথচ তাদের ভাগ্য নিয়ে সব সরকারই বার বার ছলনা করে আসছে।

সরকারের এই সময়ে এসে ডিপ্লোমা চিকিৎসকগণ আজও বিশ্বাস করেন, জনবান্ধব শেখ হাসিনার সরকার এবার তাদের ন্যায্য অধিকারের বিষয়েগুলো সুনজরে দেখবেন।


সস২৪/এসএকে
"
"
Share on Google Plus

About S A Kawsar

4 comments:

  1. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তো কিছুই বলেন না।

    ReplyDelete